শিল্পায়ন ও আধুনিক উন্নয়নের ভিড়ে ঢাকা পড়ে গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের পাটাত্তা গ্রামের স্বাভাবিক জনজীবন। সামান্য বৃষ্টিপাতেই গোটা গ্রাম এখন রূপ নেয় এক স্থায়ী জলমগ্ন জনপদে। প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে হাঁটুসমান নোংরা ও দুর্গন্ধময় পানিতে বন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন এ গ্রামের সহস্রাধিক পরিবারের মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাসাবাড়ির উঠান, চলাচলের একমাত্র সড়ক, দোকানপাট থেকে শুরু করে স্থানীয় মসজিদ—সবই এখন পানির নিচে। ফলে একদিকে যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে দেখা দিয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একসময় এই অঞ্চলে পানি জমার এমন চিত্র ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি কাঁচপুর বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য গ্রামের পাশের একটি সুবিশাল জলাশয় বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়। একই সঙ্গে চারপাশের শিল্প-কারখানা সম্প্রসারণের কারণে প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশনের নালা ও খালগুলো একে একে রুদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মাত্র একদিনের বৃষ্টিতেই পুরো গ্রামে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করে। সাময়িকভাবে সেচপাম্প ব্যবহার করে পানি সরানোর চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী কোনো পথ না থাকায় তা ব্যর্থ হচ্ছে।

বর্তমানে পাটাত্তা গ্রামের চারদিকে থৈ থৈ করছে নোংরা পানি। কোথাও চলাচলের জন্য বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও গাছের গুঁড়ি ও সিমেন্টের পাটাতন দিয়ে অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। দোকানপাটের ভেতরে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। নোংরা পানি মাড়িয়ে মসজিদে যাওয়া কিংবা কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো এখন নিত্যদিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
গ্রামের ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সালমা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি উঠে যায়। নোংরা পানিতে বসে বেচাকেনা করায় আমার ছেলেটা কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছে। শিশুদের স্কুলেও পাঠাতে পারছি না।"
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর খন্দকার, কবির হোসেন ও মোজাম্মেল খন্দকার জানান, বছরের একটি বড় সময় গ্রামটি পানির নিচে তলিয়ে থাকে। দীর্ঘদিন পচা ও দূষিত পানির সংস্পর্শে থাকায় এলাকার সাধারণ মানুষ চর্মরোগ, চুলকানি, খোসপাঁচড়া ও টাইফয়েডের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেই সঙ্গে জমা পানির তীব্র দুর্গন্ধ ও মশার অস্বাভাবিক বংশবৃদ্ধিতে পুরো এলাকায় ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম বলেন, "পাটাত্তা গ্রামের পানি নিষ্কাশনে একটি ড্রেন নির্মাণের প্রকল্প ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।"
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত এ প্রসঙ্গে জানান, জনবহুল ও বিস্তৃত এলাকা হওয়ায় এককালীন স্বল্প বাজেটে বড় ধরনের ড্রেনেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তবে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে জনস্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।