আমাদের শরীরের পুরো ভার প্রতিদিন বহন করে হাঁটু। হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, বসা কিংবা দাঁড়ানো—সব কাজেই হাঁটুর নিরলস ব্যবহার হয়। কিন্তু কিছু ছোটখাটো অভ্যাসের কারণে প্রতিদিন হাঁটুর জোড়ে অতিরিক্ত চাপ পড়তে থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। সব হাঁটুর সমস্যা বয়স বা আঘাতের কারণে হয় না; আপনি কীভাবে হাঁটেন, বসেন বা ব্যায়াম করেন, তার ওপরও হাঁটুর স্বাস্থ্য নির্ভর করে। কিছু অভ্যাস আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর মনে না হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা হাঁটুকে দুর্বল করে তুলতে পারে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন ৮টি সাধারণ অভ্যাস সম্পর্কে, যা আপনার হাঁটু দুর্বল করে দিচ্ছে:
১. দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা
সারাদিন বসে কাজ করলে হাঁটুকে সমর্থন জোগানো পেশিগুলো (বিশেষ করে কোয়াড্রিসেপস এবং গ্লুটোয়াল পেশি) দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দৈনন্দিন নড়াচড়ার সময় হাঁটু পর্যাপ্ত সাপোর্ট পায় না। এ ছাড়া অনেকক্ষণ হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকলে ওঠার সময় জয়েন্টে শক্তভাব বা জড়তা তৈরি হয়।
করণীয়: একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ান, একটু হাঁটাহাঁটি করুন বা পা দুটি হালকাভাবে নাড়াচাড়া করুন।

২. অতিরিক্ত সিঁড়ি ভাঙা
সিঁড়ি ব্যবহার ভালো শারীরিক পরিশ্রম হলেও, পর্যাপ্ত শক্তি বা প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিদিন অতিরিক্ত সিঁড়ি ভাঙলে হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। যাদের আগে থেকেই হাঁটুতে ব্যথা আছে বা পায়ের পেশি দুর্বল, তাদের জন্য এটি বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে।
করণীয়: সিঁড়ি ব্যবহার আপনার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হলে ধীরে ধীরে শক্তি বাড়ান। তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করা থেকে বিরত থাকুন এবং সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
৩. ওয়ার্ম-আপ বা শরীর গরম না করেই ব্যায়াম শুরু করা
হঠাৎ করেই দৌড়ানো, লাফানো বা স্কোয়াটের মতো ভারী ব্যায়াম শুরু করলে পেশি ও জয়েন্টে অপ্রয়োজনীয় চাপ পড়ে। সঠিক নিয়মে ওয়ার্ম-আপ করলে ধীরে ধীরে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং শরীর নড়াচড়ার জন্য প্রস্তুত হয়।
করণীয়: যেকোনো কঠিন ব্যায়াম শুরু করার আগে অন্তত কয়েক মিনিট হালকা নড়াচড়া বা স্ট্রেচিং করে শরীর গরম করে নিন। ধীরে ধীরে ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়ালে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে।
৪. ব্যায়ামের সময় হাঁটুর ব্যথা উপেক্ষা করা
ব্যায়াম করার পর সামান্য পেশি ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হাঁটুর ব্যথা কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। ব্যথার পরেও জোর করে ব্যায়াম চালিয়ে গেলে বিদ্যমান সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।
করণীয়: ব্যথা অনুভব করলে কার্যক্রম পরিবর্তন করুন, তীব্রতা কমিয়ে দিন এবং সমস্যা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৫. অনুপযুক্ত জুতো পরা
পা এবং হাঁটু হাঁটার সময় একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। জুতো যদি ঠিকমতো ফিট না করে বা পর্যাপ্ত সাপোর্ট না দেয়, তবে পায়ের পাতা মাটিতে পড়ার ধরন বদলে যায় এবং পুরো পায়ে তার প্রভাব পড়ে।

করণীয়: এর মানে এই নয় যে সবাইকে বিশেষায়িত জুতো পরতে হবে; তবে হাঁটার সময় বা দীর্ঘক্ষণ ব্যায়াম করার জন্য সবসময় আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতো নির্বাচন করুন।
৬. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
অতিরিক্ত ব্যায়াম করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি একদম অলস বা নিষ্ক্রিয় থাকাটাও সমস্যার। হিপ ও থাইয়ের পেশি শক্তিশালী থাকলে তা হাঁটুতে সহায়তা করে এবং দৈনন্দিন নড়াচড়া সহজ করে তোলে।
করণীয়: হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মতো কম চাপের ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করে গতিশীলতা ও শক্তি বজায় রাখুন। হাঁটুতে আগে থেকেই সমস্যা থাকলে পেশাজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত ব্যায়াম বেছে নিন।
৭. অতিরিক্ত শরীরের ওজন বহন করা
দৈনন্দিন কাজ করার সময় হাঁটুতে প্রচুর চাপ পড়ে, আর শরীরের ওজন অতিরিক্ত হলে সেই চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হাঁটুতে অস্বস্তি এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
করণীয়: ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চরম ডায়েট না করে টেকসই অভ্যাস গড়ে তুলুন। সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জয়েন্টের কার্যক্ষমতা উন্নত করা সম্ভব।

৮. স্কোয়াট বা ভারী জিনিস তোলার সময় ভুল কৌশল ব্যবহার করা
ব্যায়াম করার ভঙ্গি বা কৌশল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্কোয়াট, লাঞ্জ বা ভারী ওজন তোলার সময় ভুল কৌশল প্রয়োগ করলে হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
করণীয়: যেকোনো ভারী ব্যায়াম করার আগে সঠিক কৌশল শিখে নিন এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে রাখুন। আপনি যদি এ ধরনের প্রশিক্ষণে নতুন হন, তবে কোনো ট্রেইনার বা ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত উপকারী হবে।
সূত্র: এনডিটিভি