ভারতের মহারাষ্ট্রে আখখেতে কাজ করা অনেক নারী শ্রমিক জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় জরায়ু অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। মাসিকের ব্যথা, অসুস্থতা কিংবা শারীরিক সমস্যার কারণে কাজে বিরতি নিলে মজুরি হারানো ও জরিমানার মুখে পড়তে হয় তাদের।
অসুস্থ হলে চিকিৎসার প্রয়োজনের পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যাওয়ার তাগিদে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে এসব নারী শ্রমিকদের। এমনকি অস্ত্রোপচারের পরও কেউ কেউ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে আখখেতে কাজ করা এসব নারী শ্রমিকদের জীবনের এমন করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজে নিয়োজিত। তাদের অনেকে দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও পান মাত্র ৪০০ রুপির মতো মজুরি।

সাধারণত স্বামী-স্ত্রী জুটি বেঁধে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আখ কাটা ও ট্রাকে বোঝাইয়ের কাজ করেন। মহারাষ্ট্রের বীড জেলার অনেক শ্রমিক মৌসুমি কাজের জন্য অন্য এলাকায় যেতে বাধ্য হন।
অসুস্থ হলেও ছুটি নেওয়ার সুযোগ নেই
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের রামনাল এলাকার বাসিন্দা পূর্ণিমা ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তার মতো অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ এলাকা ছেড়ে কয়েক শত কিলোমিটার দূরে আখ কাটতে যান। পরিবারের ঋণ শোধ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মাসের পর মাস তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
আখশ্রমিক নারীদের অনেকেই অস্থায়ী শিবিরে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির সুবিধা ছাড়াই বসবাস করেন। মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা হলেও কাজে অনুপস্থিত থাকার সুযোগ সীমিত। এক দিন কাজ করতে না পারলে মজুরি কাটা যায়, এমনকি জরিমানাও দিতে হয় বলে জানিয়েছেন শ্রমিকেরা।

এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মাসিকের সমস্যা ও ব্যথা এড়াতে জরায়ু অপসারণের কথা ভাবছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অস্ত্রোপচারকে হিস্টেরেকটমি বলা হয়। তবে এটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার, যা কেবল চিকিৎসাগত প্রয়োজন বিবেচনা করেই করা উচিত।
পূর্ণিমা জানিয়েছেন, তিন বছর ধরে তিনি অসহনীয় ব্যথায় ভুগছেন। ভারী কাজ বন্ধ করতে পারলে তার কষ্ট কমতে পারে। কিন্তু জীবিকার জন্য আখ কাটার কাজ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। অস্ত্রোপচারের খরচ জোগাতে তাকে ঋণও নিতে হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পরও শারীরিক জটিলতা
সাবিতা নামের আরেক নারী শ্রমিক ২০২৫ সালের মার্চে জরায়ু অপসারণ করান। তার ভাষ্য, আখ ট্রাকে তোলার সময় মই বেয়ে উঠতে না পেরে তিনবার পড়ে গিয়েছিলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও কাজ বন্ধ করার সুযোগ পাননি।

অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পরও তার রক্তপাত ও পেটব্যথা অব্যাহত ছিল। পরে পুনেতে চিকিৎসা নিতে গেলে তাঁর শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে বলে জানান তিনি। অস্ত্রোপচারের আগের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ করেন সাবিতা।
নারী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা ও পরামর্শ ছাড়াই নারীদের বেসরকারি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠানো হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের এক জরিপে বীড জেলার আখশ্রমিক ৮২ হাজার ৩০৯ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণ করা হয়েছিল। জরিপে অস্ত্রোপচার করা নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কথা জানান।
এরপর শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্টও শ্রমিকদের নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তবে শ্রমিকদের দাবি, মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

আখশ্রমিকদের নিয়োগকারী ঠিকাদারদের দাবি, তারা কাউকে অস্ত্রোপচারে বাধ্য করেন না। তবে অসুস্থতাজনিত ছুটিতে মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে শ্রমিকদের সামনে জীবিকা ও স্বাস্থ্য—দুটির মধ্যে কঠিন সমঝোতার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীদের মতে, এ সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ন্যায্য মজুরি, অসুস্থতাজনিত ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জীবিকা ধরে রাখতে গিয়ে নারীদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে থাকবে।