বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ অধ্যায়জুড়ে ছিল অসুস্থতা, চিকিৎসকদের মতভেদ ও অস্ত্রোপচার নিয়ে অনিশ্চয়তা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর তাঁর অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ৮০ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বকবি।
জীবনের শেষ দিকে ১৯৩৭ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা বাড়তে থাকে। ১৯৪০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতন থেকে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পংয়ে যান তিনি। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। তাঁর তলপেটে তীব্র ব্যথা হয়, প্রস্রাবের জটিলতাও দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে স্থানীয় চিকিৎসক দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। তখনই অস্ত্রোপচার করানো হয়নি।
পরে কলকাতায় এনে তাঁর চিকিৎসা করা হয়। প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী থাকার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

১৮ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেও পুরোপুরি সুস্থ হননি। পরবর্তী মাসগুলোতে কখনো বিছানায়, কখনো চেয়ারে বসে দিন কাটত তাঁর। রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটত, শারীরিক কষ্টও ছিল। তবু সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়েও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে পৃথিবী, জীবন ও মৃত্যুকে নিয়ে গভীর উপলব্ধি।
অস্ত্রোপচার নিয়ে মতভেদ
রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক নীলরতন সরকার ও বিধানচন্দ্র রায়। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের মতপার্থক্যের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক নীলরতন সরকার। তিনি কবির অস্ত্রোপচারের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বয়স ও শারীরিক অবস্থার কারণে অস্ত্রোপচারের ধকল কবির শরীরে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষে মত দেন। রবীন্দ্রনাথের প্রোস্টেট গ্রন্থির সমস্যা ও প্রস্রাবের জটিলতা বাড়তে থাকায় অস্ত্রোপচারের পক্ষে মত জোরালো হয়। তবে কবি নিজে অস্ত্রোপচার করাতে চাননি। তিনি ওষুধ ও আগের চিকিৎসাপদ্ধতিতেই থাকতে চেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় তাঁর এই অনিচ্ছার কথা পাওয়া যায়। নিজের শরীরে অস্ত্রোপচার করানোর ভাবনা তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তাঁর কাছে শরীর শুধু চিকিৎসার বিষয় ছিল না; সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিণতির সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু বয়সজনিত দুর্বলতা ও শারীরিক অবস্থার অবনতিতে শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের আগে কবিকে ঝুঁকির বিষয়গুলো কতটা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছিল, তা নিয়েও পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আনা হয়। ৩০ জুলাই সেখানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর প্রথম দিকে চিকিৎসকেরা আশাবাদী হলেও শিগগিরই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। জ্বর, হেঁচকি ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

পরিস্থিতির অবনতি হলে খবর পাঠিয়ে নীলরতন সরকারকে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি এসে কবির নাড়ি পরীক্ষা করেন।
নীলরতন সরকার পরে ঘনিষ্ঠ মহলে মন্তব্য করেছিলেন, অস্ত্রোপচার না হলে হয়তো কবিকে আরও কিছুদিন ওষুধের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা যেত। তবে অস্ত্রোপচারই তাঁর মৃত্যুর একমাত্র কারণ ছিল—এমন কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রোস্টেট ক্যানসারের সম্ভাবনা আলোচনায় আসে। ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট প্রকাশিত টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে রবীন্দ্রনাথের শেষ অসুস্থতা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য পুনর্বিবেচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে প্রোস্টেট ক্যানসারের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এটিকে তাঁর মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি বা প্রস্রাবের জটিলতা থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট ক্যানসার ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য রোগনির্ণয়সংক্রান্ত প্রমাণ প্রয়োজন। তাই তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আলোচনা করতে হলে ঐতিহাসিক বিবরণ ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

৭ আগস্টের শেষ প্রহর
অস্ত্রোপচারের পর রবীন্দ্রনাথের অবস্থার আর উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকেরা তাঁকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে শারীরিক জটিলতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, বাংলা ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণ, দুপুরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়।
রবীন্দ্রনাথের শেষ অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা শুধু তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নয়; এটি চিকিৎসার সিদ্ধান্ত, রোগীর ইচ্ছা এবং অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তবে অস্ত্রোপচারই তাঁর মৃত্যুর একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অসুস্থতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রাখা এবং জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত লেখালেখিতে যুক্ত থাকার ঘটনাই তাঁর শেষ জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।