প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য দূর করা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে দিবসটি পালিত হয়। তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসকের পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নার্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে এখনো বিশেষায়িত সাইকিয়াট্রিক নার্সদের জন্য পৃথক পদ ও কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করা হয়নি।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে ২০২৪ সাল থেকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল অনুমোদিত এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন সাইকিয়াট্রিক নার্সিং কোর্স চালু হয়েছে। এ উদ্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষায়িত নার্স তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কোর্স সম্পন্ন করে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক্যাল ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়নি।

বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরও যদি নার্সরা সংশ্লিষ্ট বিভাগে কাজের সুযোগ না পান, তাহলে একদিকে যেমন অর্জিত দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে বিশেষায়িত নার্সিং শিক্ষায় আগ্রহও কমে যেতে পারে। ফলে সরকারি উদ্যোগে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি তাদের উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
কেন প্রয়োজন বিশেষায়িত সাইকিয়াট্রিক নার্স পদ?
মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, ওষুধ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা, রোগীর আচরণ ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন শনাক্তকরণ, সংকটকালীন সেবা, আত্মহানির ঝুঁকি মূল্যায়নে দলের সঙ্গে কাজ, পুনর্বাসন এবং রোগী ও পরিবারের কাউন্সেলিংয়ে প্রশিক্ষিত সাইকিয়াট্রিক নার্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সদের যথাযথভাবে নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রদান করা গেলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ও গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের করনীয়:
১. সরকারি হাসপাতাল ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত সাইকিয়াট্রিক নার্সের পদ সৃষ্টি ও অনুমোদন।
২. ডিপ্লোমা ইন সাইকিয়াট্রিক নার্সিং সম্পন্নকারীদের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক্যাল বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা।
৩. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ সরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত নার্সদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি।
৪. পর্যায়ক্রমে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিশেষায়িত নার্সিং সেবা সম্প্রসারণ।
৫. সাইকিয়াট্রিক নার্সদের পেশাগত উন্নয়ন, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ মানেই মানুষের সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের তাৎপর্য কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত সেবা এবং কার্যকর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: শফিউল আজম শাকিল, বিএসসি ইন নার্সিং (চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ), এমপিএইচ (বিএমইউ- নিপসম), ডিপ্লোমা ইন সাইকিয়াট্রিক নার্সিং (এনআইএমএইচ)।