দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। অন্যান্য বছরের এবার রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার বেশি। আগামী এক মাসের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে এবার প্রকোপ বেশি। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সংকটাপন্ন রোগীদের ঢাকার হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীদের পর্যাপ্তসংখ্যক ভর্তি করাও সম্ভব হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুনরায় আক্রান্ত হলে তাঁদের ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে প্রথমবার আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। এ বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় (১০-১১ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯০ জন। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ একসঙ্গে চলায় চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েছে। অনেক হাসপাতালেই রোগী ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই। গুরুতর রোগীদের আইসিইউ প্রয়োজন হলেও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা সংকট রয়েছে।
জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কিটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, সময়মতো এডিস মশা নিধন ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ না করায় রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এডিস মশা ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার বাইরে উপজেলা ও পৌরসভাগুলোও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে মশক নিধন করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু করা প্রয়োজন। একাধিকবার আক্রান্ত ব্যক্তির পুনরায় সংক্রমণে ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও খাবারে অরুচির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের রোগীদের বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে প্রথমে রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে কি না দেখতে হবে। রক্তচাপ কমে গেলে বা অন্য জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তবে সব রোগীকেই আইসিইউ বা হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই; অনেক রোগীর চিকিৎসা বহির্বিভাগেও দেওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে পাড়া-মহল্লায় মশক নিধনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।