শরীরের কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুরক্ষা, পেশিকে সহায়তা করা এবং ক্যালসিয়াম সংরক্ষণ—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাড়ের ভূমিকা রয়েছে। তাই শুধু শৈশব ও কৈশোরে নয়, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও হাড়ের সুস্থতা ধরে রাখতে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
হাড় স্থির কোনো অঙ্গ নয়; শরীরে সবসময় নতুন হাড় তৈরি এবং পুরোনো হাড় ক্ষয় হওয়ার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘রিমডেলিং’। অল্প বয়সে পুরোনো হাড় ক্ষয়ের তুলনায় নতুন হাড় তৈরির হার বেশি থাকায় হাড়ের ভর বাড়ে। সাধারণত ৩০ বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে একজন মানুষের সর্বোচ্চ হাড়ের ভর তৈরি হয়। এরপরও হাড়ের পুনর্গঠন চলতে থাকে, তবে নতুন হাড় তৈরির চেয়ে পুরোনো হাড় ক্ষয়ের পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। এ কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ রোগে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ৩০ বছর বয়সের মধ্যে যত বেশি হাড়ের ভর তৈরি করা যায়, পরবর্তী জীবনে হাড়ের শক্তি ধরে রাখার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকে।

কিছু রোগেও বাড়তে পারে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি
কিছু শারীরিক ও খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অ্যানোরেক্সিয়ার মতো খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যায় পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া এবং অতিরিক্ত কম ওজনের কারণে হাড় দুর্বল হতে পারে। এ ছাড়া থাইরয়েডের সমস্যা, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও কুশিং সিন্ড্রোমের মতো রোগও হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হাড় শক্ত রাখতে করণীয়
ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান:
হাড়ের সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৫১ থেকে ৭০ বছর বয়সি পুরুষদের প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। ৫১ বছর বা তার বেশি বয়সি নারীদের এবং ৭১ বছর বা তার বেশি বয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,২০০ মিলিগ্রাম। দুধ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার, শালগমের পাতা, কাঁটাসহ স্যামন, সার্ডিন, টুনা এবং টোফুর মতো সয়া-জাতীয় খাবার ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব না হলে সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ভিটামিন ডি নিশ্চিত করুন:
ক্যালসিয়াম শরীরে শোষণে ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯ থেকে ৭০ বছর বয়সিদের জন্য প্রতিদিন ৬০০ IU এবং ৭১ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্য ৮০০ IU ভিটামিন ডি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। স্যামন, ট্রাউট, টুনা ও ম্যাকেরেলের মতো তৈলাক্ত মাছে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ দুধ, সিরিয়াল ও কমলার রসও খাওয়া যেতে পারে। সূর্যের আলো শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতেও সহায়তা করে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন:
হাড় মজবুত রাখতে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা জরুরি। ভারোত্তোলনসহ ওজন বহনকারী ব্যায়াম হাড়ের শক্তি বাড়াতে এবং হাড় ক্ষয়ের হার কমাতে সহায়তা করতে পারে। দ্রুত হাঁটা, জগিং, নাচ, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা এবং ফুটবল, টেনিস ও পিকেলবলের মতো খেলাধুলা এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।

তামাক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন:
তামাকের ব্যবহার ও অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এসব অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করা উচিত। তামাক ছাড়তে সমস্যা হলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন:
কোনো ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করতে হলে সেটি হাড়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা চিকিৎসকের কাছে জেনে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওষুধে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকলে তা কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব।