ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে দেশের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। প্রকল্পের পুরো অর্থই সরকারি কোষাগার থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সে হিসাবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গড়ে ১০৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। আগামী রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে নতুন করে ইনমাস স্থাপন করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবনায় সুনামগঞ্জকে সিলেট বিভাগ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জকে ঢাকা বিভাগ, নোয়াখালীকে চট্টগ্রাম বিভাগ এবং পটুয়াখালীকে বরিশাল বিভাগের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে।

প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসেও ইনমাস স্থাপন করা প্রয়োজন। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পাঁচটি স্থানকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো থাইরয়েড, কিডনি, লিভার ও হৃদ্রোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারসহ জটিল রোগের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে পরমাণু চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণা এবং এ খাতে বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভবন নির্মাণ থেকে জনবল নিয়োগ
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ইনমাস ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবা চালুর জন্য দেশি ও বিদেশি যন্ত্রপাতি কেনা হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন, যানবাহন সংগ্রহ এবং আসবাবপত্র কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ, প্রকল্পের আওতায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
পুরো অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে
প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরমাণু চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা গেলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর চাপ কমতে পারে। ঢাকার বাইরে থাকা রোগীরাও নিজ নিজ অঞ্চলের কাছাকাছি এসব সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ক্যান্সার এবং থাইরয়েড, কিডনি ও লিভারের মতো রোগ নির্ণয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো গেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরের প্রতিষ্ঠানের ওপর রোগীদের নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি চিকিৎসা গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে ২২ প্রতিষ্ঠানে সেবা
প্রকল্প দলিলের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৬০ সাল থেকে পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পরমাণু চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশের ১৩টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনমাস স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে ঢাকা, মিটফোর্ড, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, ফরিদপুর, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশালে।
এছাড়া, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস) রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অত্যাধুনিক পরমাণু প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এর বাইরে সোহরাওয়ার্দী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজারের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এবং মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনমাস স্থাপনের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানসহ দেশে মোট ২২টি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রকল্প দলিলে।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনমাসের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পরমাণু চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সেবার চাহিদা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অন্য মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসেও ইনমাস স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।