রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেকের বাসিন্দা বাবুল হক ও নাজমিন আক্তার সংসারে দুই ছেলেকে ঘিরেই ছিল সব আনন্দ ও স্বপ্ন। এখন সেই সংসারে আছে শুধু ছেলেদের স্মৃতি, ব্যক্তিগত কিছু জিনিস আর ভবিষ্যৎ নিয়ে সাজানো পরিকল্পনার অসমাপ্ত অধ্যায়। মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে দুই ছেলেকে হারিয়েছে শোকস্তব্ধ পরিবারটি।
তাদের বড় ছেলে নাজমুলের মৃত্যু হয় ১২ অক্টোবর। আর ছোট ছেলে ইনতিসার মারা যায় গত ২১ সেপ্টেম্বর। দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে।
বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসান ইফতির বয়স ছিল ২৪ বছর তিনি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার ছোট ভাই মো. ইনতিসার হাসান ইয়াস পড়ত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণিতে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রথমে বাবুল হক ও ছোট ছেলে ইনতিসার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। বাবুল হককে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ইনতিসারকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাকে।

ছোট ছেলের মৃত্যুর সময় বাবা ছিলেন হাসপাতালে। বড় ছেলে নাজমুল তখন বাবার পাশে ছিলেন। ভাইকে হারানোর শোকের মধ্যেও মা–বাবাকে সামলে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। অক্টোবরে তাঁকে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১২ অক্টোবর মারা যান নাজমুল।
ছোট ছেলের মৃত্যুর সময় স্বামীকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন নাজমিন। ভেবেছিলেন, স্বামীকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কিন্তু এর মধ্যে দুই ছেলেকেই হারাতে হবে, তা কল্পনাও করেননি।
মাত্র ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে দুই ছেলে হারিয়ে শোকে কাতর নাজমিন আক্তার বলেন, ছোট মশা আমার পরিবারের সব আনন্দ নিয়ে চলে গেল। এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইল না।
নাজমিন বলেন, আমি চিন্তায় ছিলাম ছেলেদের বাবাকে নিয়ে। ভেবেছিলাম তার কিছু একটা হয়ে যাবে। এর মধ্যে আমাদের দুই ছেলেই চলে গেল। ছোট ছেলেটা বাবা ও ভাইয়ের মধ্যে সব থেকে লম্বা ছিল। বলত, সে বাসার সিনিয়র। এমনই সিনিয়র যে সে-ই সবার আগে চলে গেল।

দুই ছেলের চিকিৎসায় প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাজমিন। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের বলেছিলাম, খরচের কথা চিন্তা করবেন না। শুধু আমার ছেলেদের সুস্থ করে দিন। ছেলেদের বাড়ি নিয়ে যাব। বাড়ি তো নিতে পারলাম না।
এদিকে, দুই ছেলেকে হারানোর পর শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বাবুল হকও। নিজের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এবং পরপর দুই সন্তানের মৃত্যু—সব মিলিয়ে তিনি গুরুতর মানসিক চাপে আছেন বলে জানিয়েছেন নাজমিন।