শব্দের ফাঁদে এডিস মশাকে আকৃষ্ট করে ছবি তোলা, শনাক্ত করা ও সংখ্যা গণনার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি ও বিস্তার সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। এতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা যাচাইয়ে সহায়তা মিলতে পারে।
‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ (MAST-CloudNet) নামের এ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকরা। গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব, একই বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার আশফাকুল মুইদ।
গবেষণাটি চলতি বছর ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা জানান, যন্ত্রটিতে থাকা ক্যামেরা ফাঁদে আটকে পড়া মশার ছবি তুলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউডভিত্তিক এআই ব্যবস্থায় পাঠায়। এরপর এআই ছবি বিশ্লেষণ করে এডিস মশা শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করে।

প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদ থেকে মশা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে আলাদা করে এডিস শনাক্ত করতে হয়। এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। নতুন ব্যবস্থায় সেই কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গবেষকরা জানান, স্ত্রী মশার ডানার ঝাপটানির শব্দের অনুকরণে শব্দ তৈরি করে পুরুষ এডিস মশাকে আকৃষ্ট করে যন্ত্রটি। পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, শব্দযুক্ত ফাঁদে নীরব ফাঁদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা আকৃষ্ট হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিন ধরে চালানো প্রাথমিক মাঠপরীক্ষায় শব্দযুক্ত ফাঁদে ৪৯টি এডিস মশা এবং অন্য প্রজাতির ১০টি মশা ধরা পড়ে। অর্থাৎ ফাঁদে ধরা পড়া মশার ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ ছিল এডিস। অন্যদিকে, শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ ফাঁদে একটি এডিসসহ মোট চারটি মশা ধরা পড়ে।

বৃষ্টি, বাতাস ও ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কোলাহলের মধ্যেও যন্ত্রটি কাজ করেছে। তবে বাইরের পরিবেশে এআইয়ের শনাক্তকরণে সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। ফাঁদে ধরা পড়া ৪৯টি এডিসের মধ্যে এআই সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে ৩৫টি, যা প্রায় ৭১ শতাংশ।
গবেষকদের দাবি, শব্দের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রজাতির মশা আকৃষ্ট করা এবং ক্লাউডভিত্তিক এআই দিয়ে সেগুলো শনাক্ত করার সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে প্রায় ৯৯ ডলার ব্যয়ে। ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত ও মশার বিস্তারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে এটি আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজে লাগতে পারে। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা প্রয়োজন।

গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া আহসান হাবিব বলেন, এ ব্যবস্থা কোনো এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি এবং সময়ের সঙ্গে তাদের সংখ্যার পরিবর্তন সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে সময়মতো তথ্য দিতে পারবে। এর ভিত্তিতে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নেওয়া পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা যাচাই করা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রচলিত ফাঁদে মশা সংগ্রহ ও শনাক্ত করতে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মশা আকৃষ্ট করার পাশাপাশি শনাক্তকরণ ও তথ্য জানানোর কাজ স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে। তবে তিন দিনের মাঠপরীক্ষা কেবল প্রযুক্তিটির ব্যবহারিক সম্ভাবনা দেখিয়েছে; ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য আরও গবেষণা দরকার।
যদিও ডেঙ্গু ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশা, যন্ত্রটি পুরুষ মশাকে আকৃষ্ট করে—এ বিষয়ে আহসান হাবিব বলেন, পুরুষ মশা ধরার মাধ্যমে আগে থেকেই মিলিত স্ত্রী মশার প্রজনন বা ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ফাঁদের উদ্দেশ্য মূলত নজরদারি।
তিনি বলেন, পুরুষ এডিসের উপস্থিতি কোনো এলাকায় এডিস মশার অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এবং প্রজননস্থল খুঁজে বের করতে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু পুরুষ মশার সংখ্যা দিয়ে সংক্রমিত স্ত্রী মশার সংখ্যা বা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না।

প্রকল্পটির মূল কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আতিকে বি জাকির। গবেষণাপত্রের এই সহলেখক বলেন, হার্ডওয়্যার ও এআই সফটওয়্যার একসঙ্গে যুক্ত করে ব্যবস্থা তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ তৈরি এবং আমদানি করা উপকরণের কারণে প্রাথমিক নমুনা তৈরির ব্যয় বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, গবেষণায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়লে এ ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বাধা কমবে এবং গবেষণাগারগুলো জনস্বাস্থ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে—এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে। বর্তমানে তাঁদের দল মাস্ট-ক্লাউডনেটের পরবর্তী সংস্করণ নিয়ে কাজ করছে। ছবি বিশ্লেষণের পরিবর্তে মশার ডানার শব্দ বিশ্লেষণ করে কম খরচে এডিস শনাক্ত করার পদ্ধতিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি যন্ত্র বসিয়ে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করেছে গবেষক দলটি। এ পর্যায়ে বাইরের পরিবেশে এআইয়ের শনাক্তকরণ ক্ষমতা, আবহাওয়া থেকে যন্ত্রের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং আরও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে।