Ad
Advertisement
Doctor TV

সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬


চিকিৎসকদের নয়, ভুল ছিল পরিবারের অমনোযোগিতা: অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল

Main Image

চিকিৎসকদের নয়, ভুল ছিল পরিবারের অমনোযোগিতা: ডা. সাকলায়েন রাসেল


সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে কারিনা কায়সারের মৃত্যু ঘিরে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা ভুল চিকিৎসার অভিযোগের জবাব দিয়েছেন ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেল।
 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, চিকিৎসকদের কোনো ভুল ছিল না; বরং জ্বর ও জন্ডিসে আক্রান্ত মেয়েকে যথাসময়ে হাসপাতালে না নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বাসায় রেখে প্যারাসিটামল খাওয়ানো এবং সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাই ছিল মূল ভুল।
 

পাঠকদের জন্য অধ্যাপক ডা. সাকলায়েন রাসেলের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
ভুলের গল্প’

প্রিয় কায়সার হামিদের উদ্দেশ্যে,

যে মানুষটার পায়ে বল এলে আনন্দে কেঁপে উঠত লাল সবুজের গ্যালারি সে মানুষটা আজ কাঁদছে। আপনার এই শোকের মাঝেও কালবেলাকে দেয়া সাক্ষাৎকার, অসুস্থ অবস্থায় চ্যানেল আই ও বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া সাক্ষাৎকারসহ অনেক মতামত আমাদের নজরে এসেছে।

আপনি অভিযোগ করেছেন ইন্ডিয়ান ডাক্তারের ভাষ্যমতে, কোনো না কোনোভাবে ভুল চিকিৎসা হয়েছে (সূত্র: কালবেলা, সময় টিভি); আক্ষেপ করেছেন, বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয় না, এটা জানতেন না (সূত্র: চ্যানেল আই); ফ্যাটি লিভারের কারণে তিনি লিভার ফেইল্যর-এ আক্রান্ত হয়েছেন (সূত্র: চ্যানেল আই) ও ভুল অ্যান্টিবায়োটিক বা সিডেটিভ দেয়া হয়েছে।

সত্যি বলতে ভুল তো হয়েছে। একটা না একাধিক। আপনি যেহেতু অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন খেলোয়াড়, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সেহেতু আপনার কথার গুরুত্ব আছে। প্রতিটা কথা সমাজে ম্যাসেজ সরবরাহ করছে। একজন চিকিৎসক ও একজন স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তি হিসেবে আমি সেই ভুলগুলো আপনাকে ধরিয়ে দিতে চাই।

প্রথম ভুল, জ্বর ও জন্ডিস থাকার পরেও এক সপ্তাহের অধিক আপনি পাত্তাই দেননি। দশ-এগারো দিন বাসাতে রেখেছেন (সূত্র: চ্যানেল আই)। হতে পারে টুকটাক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আচ্ছা, জ্বরে কি প্যারাসিটামল দিয়েছিলেন? দিয়ে থাকলেই মহাবিপদ। যে মানুষটা হেপাটাইটিস-এ এবং ই তে আক্রান্ত হয়ে লিভার ফেইল্যর’র দিকে যাচ্ছে তার জন্যে সামান্য প্যারাসিটামলও কিন্তু অনেক ভয়ংকর!

দ্বিতীয়ত, লিভার ফেইল্যর হলে প্রথমেই দেহ থেকে টক্সিন বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়, আক্রান্ত হয় মস্তিস্ক। সেই সঙ্গে শুরু হয় ডিসেমিনেটেড ইনট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন (ডিআইসি) নামক মহা জটিলতা। এতে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। আর খুব দ্রুত একে একে সব অর্গান আক্রান্ত হয়। তাই ফুসফুস আক্রান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। লাইফ সাপোর্ট কাকে বলে জানেন? ফুসফুস যখন কাজ করে না, তখন কৃত্রিম ফুসফুস দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এটাকেই লাইফ সাপোর্ট (ভেন্টিলেটর) বলে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয় না—এটাও ভুল। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের যে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) আমি অপারেশন করি, সেখানেই অতীতে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। অধ্যাপক মো. আলীর তত্ত্বাবধানে এটি হয়েছিল। পিজিতেও (বিএসএমএমইউ) হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত হয় না। কারণ এটা ব্যয়বহুল। এত টাকা দিয়ে রোগীরা দেশে অপারেশন করতে চায় না।

চতুর্থত, উন্নত বিশ্বে যেখানে লিভার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) আছে, সেখানেও এ রোগে মৃত্যুর হার ৯০% এর বেশি। কেন জানেন? ওই যে ফালমিনেন্ট হেপাটিক ফেইল্যর হওয়ার সাথে সাথে রোগীর নানা জটিলতা শুরু হয়। তাই চাইলেও দ্রুত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট আয়োজন করা যায় না। যেটা ইন্ডিয়াও পারেনি।

আর ফ্যাটি লিভারের কারণে এমন হয়েছে—এই স্টেটমেন্টও ভুল। এতে করে যারা প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত তারা আতঙ্কে আছেন। এই কয় দিন এসব রোগীর ভিড় চেম্বারে বেড়ে গেছে। এটা ঠিক যে ফ্যাটি লিভার অ্যাডভান্স হলে অল্পতেই কাবু হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের ফ্যাটি লিভার নিয়ম মেনে চললে একদম ভালো অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়।

সিডেটিভ বা অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক চিকিৎসারই অংশ। আর ওনাকে প্রাথমিক নয়, টারশিয়ারি লেভেলের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বাবা হিসেবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপনার কিছু ভুল হয়েছে। মেয়েকে ফিট রাখার চেষ্টা হয়ত করেছেন, পারেননি। এলোমেলো খাবার থেকে বিরত রাখতে পারেননি। যথাসময়ে মেয়েকে হাসপাতালে নেননি। বাসায় রেখে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্যারাসিটামল খাইয়েছেন।

দ্বিতীয় ভুল হলো, সিঙ্গাপুর বা উন্নত বিশ্ব না করা সত্ত্বেও ওনাকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেছেন। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া দিয়েছেন ৫৫ লাখ, নিশ্চয়ই ইন্ডিয়াতেও ৩০/৪০ লাখ যাবে। বাবার মন, তাই হয়ত মিরাকলের আশায় গেছেন। যেকোনো সামর্থ্যবান পিতাই এটা করবে। সেজন্যে এটাকে ভুল বলার জন্যে আমি দুঃখিত। আরো একটা কারণে কাজটা ভালো হয়েছে। দেশের হাসপাতালে মারা গেলে আরো অনেক বেশি অভিযোগ আসত। উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যাওয়ার খবর যত বেশি মার্কেট পায়, উন্নত কফিনে বিদেশ থেকে ফিরে আসার খবরগুলো ততটা পায় না।

একটা দেশ সব কিছুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না। কিছু বাস্তবতা থাকে। এই যেমন—বাংলাদেশের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতাল সৈয়দপুরে, ঢাকায় না কিন্তু। খোদ আমেরিকাতেও ফাইলেরিয়া ডেডিকেটেড হাসপাতাল নেই। আপনি তো উন্নতমানের ফুটবলার। তবুও ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান কত—আমরা কিন্তু সে প্রশ্ন করছি না। কারণ কিছু সীমাবদ্ধতা, বাস্তবতা মেনে নিতে হয়।

তাই মানসিক সান্ত্বনার জন্য মনগড়া অভিযোগ না তুলে প্রয়োজনে সরাসরি ব্যবস্থা নিন। বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আনুন। পিতা হিসেবে আজ আপনি আহত, চিকিৎসক হিসেবে আমরাও আহত—ভুল চিকিৎসার মনগড়া অভিযোগের কারণে। তবে আপনি কিছু ভুল তুলে আনতেই পারতেন। যেমন—খাদ্যে ভেজাল, দূষিত পানি কিংবা স্বাস্থ্য অসচেতন প্রজন্মের ভুল জীবনযাপন নিয়ে।

পরকালে মেয়ের সাথে আবারও দেখা হোক। বেহেশতি বাগানের কোনো এক নদীর ধারে। এক জীবনের আফসোসগুলো না হয় সে সময় মিটিয়ে নিলেন। আমিন।

আরও পড়ুন